পাবনা প্রতিনিধি: পাবনার মোবারকপুরে দীর্ঘদিনের গ্যাসের সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে নতুন করে গভীর অনুসন্ধান কার্যক্রম শুরু করেছে রাষ্ট্রীয় তেল-গ্যাস অনুসন্ধান ও উত্তোলনকারী প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম এক্সপ্লোরেশন অ্যান্ড প্রোডাকশন কোম্পানি লিমিটেড—বাপেক্স। উন্নত প্রযুক্তি ব্যবহার করে এবার ৬ কিলোমিটারেরও বেশি গভীরে কূপ খননের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, মোবারকপুরে বারবার পরিচালিত ভূকম্পন জরিপে গ্যাসের সম্ভাবনার ইতিবাচক তথ্য পাওয়া গেছে। প্রকল্পটি সফল হলে এটি উত্তরাঞ্চলের প্রথম কার্যকর গ্যাসক্ষেত্র হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
বর্তমানে পাবনার সুজানগর উপজেলার আহমেদপুর ইউনিয়নের কুড়িপাড়া এলাকায় অধিগ্রহণ করা প্রায় ৬ একর জমিতে প্রকল্পের প্রাথমিক উন্নয়নকাজ চলছে। বাপেক্সের উদ্যোগে সেখানে পাইলিং ও ভূমি উন্নয়নের কাজ শুরু হয়েছে। প্রায় ৫ কোটি ৫০ লাখ টাকা ব্যয়ে পাইলিংয়ের কাজ গত ২৭ জুলাই শুরু হয়েছে এবং চলতি বছরের ডিসেম্বরের মধ্যে তা শেষ করার পরিকল্পনা রয়েছে।
৬ কিলোমিটারের বেশি গভীরে যাবে কূপ
মোবারকপুরে এর আগে ২০১৪ সালে প্রায় ৮৯ কোটি টাকা ব্যয়ে ৪ দশমিক ৫ কিলোমিটার গভীরতায় কূপ খননের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। কিন্তু ভূগর্ভে অতিরিক্ত গ্যাসের চাপ এবং প্রয়োজনীয় প্রযুক্তিগত সক্ষমতার সীমাবদ্ধতার কারণে সে সময় কাজ স্থগিত করতে হয়।
এবার সেই অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে আন্তর্জাতিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে আরও গভীরে যাওয়ার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। কূপটি ৬ কিলোমিটারেরও বেশি গভীরতায় খনন করা হবে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।
১ হাজার ১৩৬ কোটি টাকার মেগা প্রকল্প
দেশের গ্যাস উৎপাদন বাড়াতে তিনটি গভীর অনুসন্ধান কূপ খননের জন্য সরকার ১ হাজার ১৩৬ কোটি ২৫ লাখ টাকার একটি প্রকল্প অনুমোদন করেছে। এর আওতায় কুমিল্লার শ্রীকাইল ডিপ-১, পাবনার মোবারকপুর ডিপ-১ এবং সিলেটের ফেঞ্চুগঞ্জ সাউথ-১ কূপ খননের পরিকল্পনা রয়েছে। প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করছে বাপেক্স।
মোবারকপুরের কূপ খননের জন্য চীনের CNPC Chuanqing Drilling Engineering Company (CCDC)-এর সঙ্গে চুক্তি করা হয়েছে। প্রতিষ্ঠানটি বর্তমানে কুমিল্লার শ্রীকাইল এলাকায় কাজ করছে। সেখানে কাজ শেষ হলে রিগ ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম মোবারকপুরে স্থানান্তর করা হবে।
২০২৮ সালে মূল খননকাজ
প্রকল্প সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের তথ্য অনুযায়ী, মোবারকপুরে মূল ড্রিলিং কার্যক্রম ২০২৮ সালের জুনের মাঝামাঝি সময়ে শুরু হওয়ার কথা রয়েছে। সবকিছু পরিকল্পনা অনুযায়ী এগোলে ওই বছরের শেষ নাগাদ গ্যাস উত্তোলন শুরু হতে পারে।
প্রাথমিক ধারণা অনুযায়ী, কূপটি সফল হলে দৈনিক অন্তত ২ কোটি ঘনফুট (২০ মিলিয়ন ঘনফুট) গ্যাস উৎপাদনের সম্ভাবনা রয়েছে। এই হারে প্রায় ২০ বছর গ্যাস পাওয়া যেতে পারে বলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা আশা করছেন।
দীর্ঘদিনের অপেক্ষায় পাবনাবাসী
মোবারকপুরে গ্যাসের সম্ভাবনা নিয়ে কয়েক দশক ধরেই আলোচনা রয়েছে। ১৯৮০ ও ১৯৮৩ সালে পরিচালিত ভূকম্পন জরিপের পাশাপাশি পরবর্তী সময়ে বাপেক্সের জরিপেও এখানে গ্যাসের সম্ভাবনার ইঙ্গিত পাওয়া যায়। ২০১৭ সালে মোবারকপুরকে দেশের ২৭তম গ্যাসক্ষেত্র হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছিল।
স্থানীয় বাসিন্দাদের প্রত্যাশা, এবার আধুনিক প্রযুক্তি ও গভীর অনুসন্ধানের মাধ্যমে মোবারকপুরের গ্যাসের সম্ভাবনা বাস্তবে রূপ নেবে। সফলভাবে গ্যাস উত্তোলন করা গেলে শুধু পাবনা নয়, উত্তরাঞ্চলের জ্বালানি ও শিল্প খাতেও এর ইতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের মতে, মোবারকপুরে একটি কূপ সফল হলে আশপাশের এলাকায় পর্যায়ক্রমে আরও অনুসন্ধান ও কূপ খননের সুযোগ তৈরি হবে। ফলে দীর্ঘদিনের অপেক্ষার অবসান ঘটিয়ে উত্তরাঞ্চলে নতুন গ্যাসের সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচিত হতে পারে।


