Google search engine
Homeইসলামএকটি শব্দ চয়নে অসতর্কতা! একটি বাতিল নজরিয়ার প্রতিনিধিত্ব!

একটি শব্দ চয়নে অসতর্কতা! একটি বাতিল নজরিয়ার প্রতিনিধিত্ব!

একটি শব্দ চয়নে অসতর্কতা! একটি বাতিল নজরিয়ার প্রতিনিধিত্ব!
গতকাল ২রা সেপ্টেম্বর, রোজ বুধবার, বগুড়ার ঐতিহাসিক টিটু মিলনায়তনে একটি সেমিনারে অংশগ্রহণ করি। ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চের পর পাকিস্তানি বাহিনীর বিরুদ্ধে প্রতিরোধযুদ্ধে শহীদ হওয়া বগুড়া জেলা স্কুলের দশম শ্রেণির ছাত্র টিটুর স্মরণে এই মিলনায়তনের নামকরণ করা হয়েছে “টিটু মিলনায়তন”।
“ওলামায়ে দেওবন্দের অবদান” শীর্ষক সেমিনারটিতে একটি বাতিল ফেরকার বিরুদ্ধে আলোচনা করার জন্য আমাকে বিষয়বস্তু দেওয়া হয়েছিলো। সময় স্বল্পতার কারণে বিষয়টি খুব সংক্ষিপ্ত আকারেই শেষ করি।
স্বাভাবিকভাবেই অন্য কারো বক্তব্য শোনার অভ্যাস আমার খুব একটা নেই। নিজের বক্তব্য দিয়ে চলে আসাটা যেনো আমার বদঅভ্যাসে পরিণত হয়েছে। এর শুরু অবশ্য ছাত্রজীবন থেকেই। নিজের তাকরার করা শেষ হলে অন্য কারো তাকরার না শুনে নিজের মুতালাআ নিয়ে বসে যেতাম। বসে বসে হয়তো পরের দিনের সবকের মুতালাআ করতাম।
কিন্তু গতকাল মজলিসের আদব রক্ষার্থে শেষ পর্যন্ত বসে ছিলাম। আমার বক্তব্যের পরপরই বক্তব্য রাখেন জামিল মাদরাসার সিনিয়র মুহাদ্দিস, হযরতুল উস্তায মাওলানা আব্দুল হক্ব আযাদ সাহেব হাফিযাহুল্লাহ।
পাহারাদারের প্রসঙ্গ আলোচনা করতে গিয়ে তিনি বলেন—“তুমি যদি এমন পাহারাদার হও, যে চোরকে বাড়ির ভেতরে ঢোকার রাস্তা করে দেয়, তাহলে তোমার মতো কুলাঙ্গার পাহারাদার আমাদের দরকার নাই।”
কারণ, পাহারাদারের দায়িত্ব হলো—বাইরের কোনো চোর-বাটপারকে ভেতরে প্রবেশ করতে না দেওয়া এবং ভেতরের কোনো জিনিস বাইরে বের হতে না দেওয়া।
অবশ্য তার আগে তিনি নাম ধরে মাওলানা মামুনুল হক সাহেব এবং তাঁর পিতা, শাইখুল হাদীস আল্লামা আজিজুল হক রহ.-এর চিন্তাধারার বৈপরীত্য নিয়েও আলোচনা করেন। স্বাভাবিকভাবেই “তোমার মতো কুলাঙ্গার পাহারাদার”—এই কথাগুলো মাওলানা মামুনুল হক সাহেবের দিকে ফেরানো হবে। হচ্ছেও তাই।
বিষয়টি নিয়ে আমি হযরত মাওলানা আব্দুল হক আযাদ সাহেব হুজুরের সঙ্গে কথা বলেছিলাম। তিনি বললেন, “আমি সরাসরি মামুনকে কুলাঙ্গার বলিনি। আমি বলেছি: ‘যদি পাহারাদার ঘরের মধ্যে চোর-বাটপারকে ঢোকার সুযোগ করে দেয়, তাহলে এই ধরনের কুলাঙ্গার পাহারাদার আমাদের দরকার নাই।’”
অর্থাৎ, তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, এই কিসিমের পাহারাদারকেই কুলাঙ্গার পাহারাদার বলা হয়েছে; মামুন সাহেবকে নাম ধরে কুলাঙ্গার পাহারাদার বলা হয়নি।
সব মিলিয়ে যা হয়েছে, তা হলো—মুহতারম মাওলানা আব্দুল হক আযাদ সাহেব হুজুরের শব্দচয়নে অসতর্কতা হয়েছে; এটা স্পষ্টই বোঝা যাচ্ছে।
বয়স হিসেবে আল্লামা মুহিবুল্লাহ বাবুনগরী হাফিযাহুল্লাহর “হানকির পোয়া” এবং আযাদ সাহেব হুজুরের “কুলাঙ্গার পাহারাদার”—উভয় শব্দই অমার্জিত; তবে অমার্জনীয় নয়। বয়স বেশি হলে, তার সঙ্গে অন্তরের ব্যথা ও দরদও যখন প্রবল থাকে, তখন আপন থেকে আপনজনদের ব্যাপারেও কখনো কখনো এমন কঠিন শব্দ মুখ থেকে বেরিয়ে যেতে পারে।
কিন্তু প্রশ্ন হলো—এর পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া যা হচ্ছে, তা কি ঠিক হচ্ছে?
উনাকে একজন গালি দিচ্ছে—“বুইরা খাটাশ” বলে। আবার জেলার একজন সর্বোচ্চ পর্যায়ের দায়িত্বশীল সেই গালি শেয়ার করছেন। ইতিমধ্যে জামিল মাদরাসার ছাত্রদেরকেও উসকিয়ে দেওয়া হচ্ছে—তাদের নিজেদের উস্তাদের বিরুদ্ধে আন্দোলন করার জন্য। সাইজ করার জন্য।
কী চমৎকার!
সীমা লঙ্ঘনের জবাব কি আরেকটি সীমা লঙ্ঘন?
আবার কিছু তথাকথিত মাশায়েখ আক্রোশে ফেটে পড়ে কয়েক দফা ওয়াজের ডালি সাজিয়ে নিয়ে এসেছেন; অথচ যে বিষয় নিয়ে এত ওয়াজের আয়োজন, তার কোনো একটির ওপরও তার নিজেরই আমল নেই। দফা ধরে ধরে প্রমাণ করা যাবে তার মুখের সামনে। যদিও এমনটা আমাদের আদত নেই।
আমি অবশ্যই মাওলানা আব্দুল হক আযাদ সাহেব হুজুরের এই অসতর্ক শব্দচয়ন সমর্থন করি না। শব্দটি যখন প্রথম কানে এসেছে, তখনই ভালো লাগেনি। এই শব্দের পরিবর্তে আরও মার্জিত, পরিশীলিত ও গ্রহণযোগ্য কোনো শব্দ বলা যেতে পারতো। সমালোচনা হবে। কিন্তু মার্জিত শব্দে।
অতএব আযাদ সাহেব হুজুরের শব্দ চয়ন নিয়ে আপত্তি থাকতেই পারে, থাকা উচিতও।
কিন্তু এর সঙ্গে আরও একটি বিষয় গভীরভাবে চিন্তা করার আছে।
কওমী মাদরাসার মুরব্বিদের ভেতরে যে একটি খটকা, যে একটি আশঙ্কা সৃষ্টি হয়েছে। মাদরাসাগুলোর অভ্যন্তরে বাতিলের অনুপ্রবেশের জন্য আমাদের কিছু অসতর্ক রাজনৈতিক সিদ্ধান্তই দায়ী হয়ে উঠছে কি না; কারো কারো কারণে তারা কওমী অঙ্গনে প্রবেশের সুযোগ পাচ্ছে কি না; দরসে নিজামীর মধ্যে বিভক্তি সৃষ্টির পথ তৈরি হচ্ছে কি না; এই আশঙ্কাগুলোও কি একেবারে অমূলক?
হয়তো এই আশঙ্কা থেকেই কারো কারো মুখ থেকে এসব শক্ত কথা বেরিয়ে আসতে শুরু করেছে। আল্লামা নূরুল ইসলাম ওলীপুরী সাহেব, ডিআইটির মাওলানা আব্দুল আউয়াল সাহেবের পর এবার মাওলানা আব্দুল হক আযাদ সাহেব। প্রবীণ ওলামায়ে কেরামের একটি জামাআত।
তাঁদের অন্তরে যে ব্যথা, কওমী সন্তানদের ভবিষ্যৎ নিয়ে যে উৎকণ্ঠা, কওমী মাদরাসার স্বাতন্ত্র্য ও ইলমী পরিবেশ নিয়ে যে আশঙ্কা—সেই জায়গা থেকে তাঁদের মুখ থেকে এমন অসতর্ক শব্দচয়ন বেরিয়ে আসা ঠিক না হলেও, এটাকে কি জুরমে আজীম বলা যায়? কুপের মধ্যে যেই ইঁদুরের কারণে এতো কথা সরাসরি কুপের মধ্য হতে সেই ইঁদুর তুলে ফেললেই তো সব ঝামেলা মিটে যায়। মুহতারাম আমীরে মজলিসের একটি সিদ্ধান্তই সব কিছু মিটিয়ে দিতে পারে।
আমি মনে করি, বিষয়টি এত সরল নয়।
একটি শব্দের ভুলকে ভুল বলা এক কথা; আর সেই ভুলকে কেন্দ্র করে একজন আলেমের অন্তরের ব্যথা, তাঁর আশঙ্কা এবং তিনি যে মূল প্রশ্নটি সামনে আনতে চেয়েছেন; সেটিকেই সম্পূর্ণ অস্বীকার করে দেওয়া আরেক কথা।
আল্লাহ তাআলা বলেন—
وَلَا يَجْرِمَنَّكُمْ شَنَآنُ قَوْمٍ عَلَىٰ أَلَّا تَعْدِلُوا ۚ اعْدِلُوا هُوَ أَقْرَبُ لِلتَّقْوَىٰ
“কোনো সম্প্রদায়ের প্রতি বিদ্বেষ যেন তোমাদেরকে ন্যায়বিচার থেকে বিরত না রাখে। তোমরা ন্যায়বিচার করো; সেটিই তাকওয়ার অধিক নিকটবর্তী।”
তাই অন্যের ভুলের বিচার করতে গিয়েও আমাদের ইনসাফের সীমা অতিক্রম করা চলবে না।
কেউ অমার্জিত শব্দ ব্যবহার করলে তাকে বলা হবে শব্দটি ঠিক হয়নি।
কিন্তু তার জবাবে গালি দেওয়া, অপমান করা, সামাজিকভাবে হেয় করা কিংবা ছাত্রদেরকে নিজেদের উস্তাদের বিরুদ্ধে দাঁড় করিয়ে দেওয়ার মতো উস্কানিমূলক লেখালেখি;এগুলোও কোনোভাবেই সমর্থনযোগ্য হতে পারে না।
রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:
لَيْسَ الْمُؤْمِنُ بِالطَّعَّانِ، وَلَا اللَّعَّانِ، وَلَا الْفَاحِشِ، وَلَا الْبَذِيءِ
“মুমিন দোষারোপকারী, অভিশাপদাতা, অশ্লীলভাষী ও কদর্যভাষী নয়।”
সুতরাং অমার্জিত শব্দ চয়ন যেমন ঠিক হয়নি তেমনি একটি অমার্জিত শব্দের প্রতিবাদ করতে গিয়ে যদি আমরা নিজেরাই আরও অমার্জিত ভাষার আশ্রয় নেই, তাহলে আমরা আসলে কোন নীতির বিজয় চাইছি?
প্রশ্নটি এখানেই:
একজন কওমীদের পাহারাদার দাবি করে এমন কোনো বাতিল নজরিয়ার প্রতিনিধিত্ব করছেন বলে অনেকে মনে করছেন;যার মাধ্যমে কওমী অঙ্গনে বাতিল চিন্তার অনুপ্রবেশের আশঙ্কা তৈরি হচ্ছে। কিছু বাস্তবতাও দেখা যাচ্ছে। ক্লাসে ক্লাসে ছাত্রদের মধ্যে দুই গ্রুপ হয়ে তর্কবিতর্ক এমনকি মারামারি পর্যন্ত হচ্ছে। ক্বওমী মাদরাসার অভ্যন্তরে জাশির ক্বওমী ছাত্র পরিষদের কমিটি গঠন করা হচ্ছে।
আরেকজন সেই আশঙ্কার কথা বলতে গিয়ে অসতর্ক শব্দচয়ন করছেন।
দুটিকে কি একই পাল্লায় মাপা হবে?
একদিকে একটি অমার্জিত শব্দ চয়ন;
অন্যদিকে একটি চিন্তাধারা, একটি নজরিয়া, একটি রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত বা প্রবণতা; যার মাধ্যমে কওমী মাদরাসার ভেতরে বিভক্তি, অনুপ্রবেশ কিংবা আকাবিরের রেখে যাওয়া ইলমী আমানতের ধারার ওপর প্রভাব বিস্তারের আশঙ্কা তৈরি হতে পারে।
কোনটি বেশি গর্হিত?
ভেবে দেখবেন কি?
আমি কারো গালি সমর্থন করি না।
আমি আযাদ সাহেব হুজুরের অসতর্ক শব্দচয়নও সমর্থন করি না।
কিন্তু একই সঙ্গে কওমী মাদরাসার ভবিষ্যৎ, আকীদা, মাসলাক, দরসে নিজামী এবং আকাবিরের ইলমী মীরাস নিয়ে যে আশঙ্কা সৃষ্টি হয়েছে, সেটিকেও কেবল একটি শব্দের আড়ালে চাপা দিয়ে দেওয়ার পক্ষপাতী নই।
শব্দের ভুল সংশোধন করা যায়;
কিন্তু ভুল নজরিয়া শিকড় গেড়ে বসলে তার অশুভ পরিণতি অনেক সুদূরপ্রসারী হতে পারে।
তাই আসুন, ব্যক্তির পরিবর্তে বিষয় নিয়ে কথা বলি।
গালির পরিবর্তে দলীল নিয়ে আসি।
আবেগের পরিবর্তে ইনসাফ করি।
আর কওমী মাদরাসার ভবিষ্যৎ নিয়ে যারা ব্যথিত, তাদের ব্যথাকে উপহাস না করে , তাদের আশঙ্কার সত্যতা বা অসত্যতা ইলম ও দলীলের আলোকে যাচাই করি।
কারণ আমাদের লড়াই কোনো ব্যক্তির বিরুদ্ধে নয়।
আমাদের দায়িত্ব; আকীদা রক্ষা করা।
আমাদের দায়িত্ব; সহীহ ইলমের ধারা রক্ষা করা।
আমাদের দায়িত্ব;দরসে নিজামীর ঐতিহ্য রক্ষা করা।
আমাদের দায়িত্ব; আকাবিরের মীরাস রক্ষা করা।
এবং আমাদের দায়িত্ব;কওমী সন্তানদের ভবিষ্যৎ রক্ষা করা।
সুতরাং শেষ প্রশ্নটি আবারও রেখে গেলাম:
একজন কওমীদের পাহারাদার দাবি করে বাতিল নজরিয়ার প্রতিনিধিত্ব করছেন বলে অনেকে মনে করছেন; আরেকজন সেই আশঙ্কা প্রকাশ করতে গিয়ে অসতর্ক শব্দচয়ন করছেন;কোনটি বেশি গর্হিত?
ভেবে দেখবেন কি?
হাঁ, জনগণের পালস বুঝে চলা উচিৎ। অবশ্যই। তবে তা সবার জন্যই।
লেখক : মুফতী শফী কাসেমী
সাবেক মুহাদ্দিস, জামিল মাদরাসা বগুড়া।
মুহতামিম, জামিয়াতুর রশিদ বগুড়া।
আরো সংবাদ

কমেন্ট করুন

Please enter your comment!
Please enter your name here

- Advertisment -
Google search engine

সর্বশেষ