Google search engine
Homeইসলামতালাক সম্পর্কে সমাজে প্রচলিত কিছু মারাত্মক ভুল ধারণা: শরীয়তের সঠিক দিকনির্দেশনা

তালাক সম্পর্কে সমাজে প্রচলিত কিছু মারাত্মক ভুল ধারণা: শরীয়তের সঠিক দিকনির্দেশনা

বিয়ে ইসলামের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ একটি সুন্নত এবং দাম্পত্য জীবন আল্লাহ তাআলার পক্ষ থেকে মানুষের জন্য একটি মহামূল্যবান নেয়ামত। এই সম্পর্কের মাধ্যমে পরিবার গড়ে ওঠে, সন্তান-সন্ততি লালিত-পালিত হয় এবং সমাজে শান্তি ও স্থিতিশীলতা প্রতিষ্ঠিত হয়। তাই ইসলাম এই সম্পর্ককে রক্ষা করার প্রতি সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়েছে।

অপরদিকে, যখন কোনোভাবেই স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে মিল-মহব্বত ও শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান সম্ভব না হয়, তখন সর্বশেষ সমাধান হিসেবে তালাকের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। কিন্তু অত্যন্ত দুঃখজনক হলেও সত্য, বর্তমানে আমাদের সমাজে তালাকের বিধান সম্পর্কে অজ্ঞতা, ভুল ধারণা ও মনগড়া মাসআলার কারণে অসংখ্য পরিবার ভেঙে যাচ্ছে এবং অনেক মানুষ না জেনেই বড় ধরনের গুনাহে জড়িয়ে পড়ছেন।

তালাক: প্রয়োজনের সময় ব্যবহারের একটি শরয়ী বিধান

শরীয়তের দৃষ্টিতে বিনা প্রয়োজনে তালাক দেওয়া বা তালাক চাওয়া সমর্থনযোগ্য নয়। বরং স্বামী-স্ত্রীর উচিত পারস্পরিক সহনশীলতা, ক্ষমাশীলতা, পরামর্শ এবং পরিবারের অভিভাবকদের মাধ্যমে সমস্যা সমাধানের সর্বোচ্চ চেষ্টা করা। একান্ত অনিবার্য পরিস্থিতিতেই তালাকের পথে যাওয়া উচিত।

এ কারণে প্রত্যেক মুসলিমের জন্য বিয়ের আগে দাম্পত্য জীবনের প্রয়োজনীয় মাসআলা এবং বিশেষ করে তালাকের বিধান সম্পর্কে জ্ঞান অর্জন করা অত্যন্ত জরুরি।

তালাকের সঠিক পদ্ধতি কী?

শরীয়ত নির্দেশনা দিয়েছে যে, যদি তালাক দিতেই হয়, তাহলে স্ত্রীর পবিত্র (হায়েজমুক্ত) অবস্থায় সহবাসবিহীন সময়ে মাত্র এক তালাক দেওয়াই সুন্নাহসম্মত পদ্ধতি। এরপর ইদ্দতের মধ্যে উভয়ের জন্য পুনর্বিবেচনা ও সম্পর্ক পুনরুদ্ধারের সুযোগ থাকে।

অপরদিকে, একসঙ্গে তিন তালাক দেওয়া বা তালাকের সঙ্গে অপ্রয়োজনীয় শব্দ যোগ করা শরীয়তের নির্দেশনার পরিপন্থী এবং এর পরিণতি অত্যন্ত ভয়াবহ।

সমাজে প্রচলিত কয়েকটি ভুল ধারণা

১. “তিন তালাক না দিলে তালাক হয় না”

এটি সম্পূর্ণ ভুল ধারণা। শরীয়তে তালাক কার্যকর হওয়ার জন্য একসঙ্গে তিন তালাক দেওয়া কোনো শর্ত নয়। বরং সঠিক পদ্ধতি হলো একবারে একটি তালাক দেওয়া। একসঙ্গে তিন তালাক দেওয়া হারাম ও গুরুতর গুনাহের কাজ। তবে কেউ এভাবে তিন তালাক দিলে অধিকাংশ ফকীহের মতে তিন তালাকই কার্যকর হয়ে বৈবাহিক সম্পর্ক সম্পূর্ণভাবে শেষ হয়ে যায়।

২. তালাকের সঙ্গে “বায়েন” শব্দ যোগ করা জরুরি

অনেকেই মনে করেন, শুধু “তালাক” বললে হয় না; “বায়েন” শব্দও বলতে হবে। এটি সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন ধারণা। শুধু “তালাক” বললেই তালাক সংঘটিত হয়। বরং “বায়েন” শব্দ ব্যবহার করলে অনেক ক্ষেত্রে স্বামীর রুজু (ইদ্দতের মধ্যে স্ত্রীকে ফিরিয়ে নেওয়া)-এর সুযোগ সংকুচিত হয়ে যায়।

৩. একসঙ্গে তিন তালাক দিলে তালাক হয় না

এ ধারণাটিও ভুল। একসঙ্গে তিন তালাক দেওয়া শরীয়তসম্মত নয় এবং এটি বড় গুনাহ। তবে অধিকাংশ ইসলামী ফিকহি মতানুযায়ী, এভাবে তিন তালাক দিলে তিন তালাকই কার্যকর হয়ে যায় এবং স্বামী-স্ত্রীর বৈবাহিক সম্পর্ক সম্পূর্ণভাবে শেষ হয়ে যায়।

৪. গর্ভাবস্থায় তালাক কার্যকর হয় না

এ কথারও কোনো শরয়ী ভিত্তি নেই। স্ত্রী গর্ভবতী হোক বা না হোক, শরীয়তের শর্ত অনুযায়ী তালাক দিলে তা কার্যকর হয়।

৫. সাক্ষী ছাড়া তালাক হয় না

অনেকে মনে করেন, তালাকের সময় সাক্ষী উপস্থিত না থাকলে তালাক কার্যকর হয় না। এটিও ভুল ধারণা। সাক্ষী বিবাহের জন্য অপরিহার্য হলেও তালাক কার্যকর হওয়ার জন্য সাক্ষীর উপস্থিতি শর্ত নয়। স্বামী একাকী অবস্থায়ও তালাক দিলে তা কার্যকর হতে পারে।

৬. রাগের মাথায় তালাক দিলে তালাক হয় না

সমাজে সবচেয়ে বেশি প্রচলিত ভুল ধারণাগুলোর একটি এটি। বাস্তবে অধিকাংশ তালাকই রাগের মুহূর্তে ঘটে থাকে। শরীয়তের দৃষ্টিতে সাধারণ রাগের মধ্যে স্পষ্টভাবে তালাক উচ্চারণ করলে তালাক কার্যকর হয়। তবে যদি রাগ এতটাই প্রবল হয় যে ব্যক্তি সম্পূর্ণ জ্ঞানশূন্য হয়ে যায় এবং পরে কী বলেছে তা মোটেই মনে না থাকে, সে ক্ষেত্রে আলেমদের মধ্যে বিস্তারিত আলোচনা রয়েছে এবং বিষয়টি যোগ্য মুফতির মাধ্যমে নির্ধারণ করতে হয়।

তালাকের শব্দ উচ্চারণে সর্বোচ্চ সতর্কতা

তালাক এমন একটি বিষয়, যেখানে অসাবধানতা মারাত্মক পরিণতি ডেকে আনতে পারে। অনেক সময় মানুষ রাগ, ঠাট্টা বা আবেগের বশে এমন শব্দ উচ্চারণ করে বসে, যার ফলে দাম্পত্য সম্পর্ক স্থায়ীভাবে শেষ হয়ে যায়। তাই প্রত্যেক স্বামীর উচিত তালাকের শব্দ মুখে আনা থেকে সর্বোচ্চ সতর্ক থাকা।

শরয়ী বিধান না জেনে একসঙ্গে বসবাসের পরিণতি

যদি বাস্তবেই তালাক কার্যকর হয়ে যায় এবং শরীয়তের দৃষ্টিতে স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্ক শেষ হয়ে যায়, এরপরও অজ্ঞতা, ভুল ব্যাখ্যা বা মনগড়া মাসআলার ওপর নির্ভর করে একসঙ্গে বসবাস করা বৈধ নয়। ইসলামী শরীয়ত এ বিষয়ে অত্যন্ত কঠোর সতর্কতা দিয়েছে। তাই তালাকসংক্রান্ত যেকোনো জটিল বিষয়ে অবশ্যই যোগ্য ও বিশ্বস্ত মুফতি বা আলেমের শরণাপন্ন হওয়া উচিত।

উপসংহার

বিয়ে শুধু একটি সামাজিক চুক্তি নয়; এটি একটি ইবাদত, একটি আমানত এবং আজীবনের দায়িত্ব। তাই দাম্পত্য জীবনে ধৈর্য, সহনশীলতা, পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ এবং শরীয়তের বিধান মেনে চলাই একজন মুসলিমের কর্তব্য।

তালাককে কখনো রাগ, আবেগ কিংবা প্রতিশোধের হাতিয়ার বানানো উচিত নয়। একই সঙ্গে তালাক সম্পর্কে প্রচলিত ভুল ধারণা পরিহার করে কুরআন-সুন্নাহ ও নির্ভরযোগ্য ফিকহি নির্দেশনার আলোকে জীবন পরিচালনা করাই একজন সচেতন মুসলিমের দায়িত্ব।

আল্লাহ তাআলা আমাদের সকলকে দাম্পত্য জীবনের হক যথাযথভাবে আদায় করার তাওফীক দান করুন, তালাকের অপব্যবহার থেকে হেফাজত করুন এবং শরীয়তের সঠিক বিধান অনুযায়ী জীবন পরিচালনার তাওফীক দান করুন। আমীন।

(বিঃদ্রঃ: তালাকের প্রতিটি ঘটনা আলাদা। কোনো নির্দিষ্ট ঘটনার শরয়ী বিধান জানতে হলে সম্পূর্ণ ঘটনা গোপন না করে একজন নির্ভরযোগ্য মুফতির কাছে উপস্থাপন করা আবশ্যক।)

লেখক: মাওলানা মুহাম্মাদ আব্দুল মালেক

খতীব, বায়তুল মুকাররম জাতীয় মসজিদ।

আমিনুত তালীম, মারকাযুদ দাওয়াহ, ঢাকা।

আরো সংবাদ

কমেন্ট করুন

Please enter your comment!
Please enter your name here

- Advertisment -
Google search engine

সর্বশেষ