Google search engine
Homeস্থাপত্যপাবনার জোড় বাংলা মন্দির: ইতিহাস, স্থাপত্য ও ঐতিহ্যের এক অনন্য নিদর্শন

পাবনার জোড় বাংলা মন্দির: ইতিহাস, স্থাপত্য ও ঐতিহ্যের এক অনন্য নিদর্শন

নিজস্ব প্রতিবেদক, পাবনা : পাবনা শহরের দক্ষিণ রাঘবপুরের জোড়বাংলা পাড়ায় নীরবে দাঁড়িয়ে আছে কয়েক শত বছরের পুরোনো ঐতিহাসিক স্থাপনা জোড় বাংলা মন্দির। ইট, পোড়ামাটির কারুকাজ আর বাংলার ঐতিহ্যবাহী দোচালা স্থাপত্যের অনন্য সমন্বয়ে গড়ে ওঠা এই মন্দির শুধু একটি ধর্মীয় স্থাপনা নয়—এটি পাবনার ইতিহাস, শিল্প ও স্থাপত্য ঐতিহ্যের গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষ্য।

বাংলাদেশের প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের সংরক্ষিত এই স্থাপনাটি পাবনা শহরের অন্যতম দর্শনীয় ও প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন হিসেবে পরিচিত।

নির্মাণের ইতিহাস

জোড় বাংলা মন্দিরের সঠিক নির্মাণকাল নিয়ে ইতিহাসবিদ ও গবেষকদের মধ্যে মতভেদ রয়েছে। মন্দিরে কোনো শিলালিপি পাওয়া যায়নি। ফলে কোন সালে এটি নির্মিত হয়েছিল, তা নিশ্চিতভাবে বলা সম্ভব নয়।

তবে সরকারি বিভিন্ন নথি ও স্থানীয় জনশ্রুতি অনুযায়ী, মুর্শিদাবাদের নবাবের তহশিলদার ব্রজমোহন ক্রোড়ী মন্দিরটি নির্মাণ করেছিলেন। সরকারি তথ্যসূত্রে এর নির্মাণকাল অষ্টাদশ শতক বলে উল্লেখ করা হয়েছে। পাবনা জেলা প্রশাসনের তথ্যেও আঠারো শতকের মধ্যভাগে ব্রজমোহন ক্রোড়ীর নির্মাণের কথা স্থানীয় জনশ্রুতিতে উল্লেখ করা হয়েছে।

অন্যদিকে, কিছু গবেষণায় নির্মাণকাল নিয়ে ভিন্ন মতও পাওয়া যায়। তাই মন্দিরটির বয়স বা নির্মাণের নির্দিষ্ট সাল উল্লেখ করার ক্ষেত্রে সতর্কতা প্রয়োজন।

কেন নাম ‘জোড় বাংলা’?

মন্দিরটির স্থাপত্যে বাংলার ঐতিহ্যবাহী দুটি দোচালা ঘরের আকৃতি পাশাপাশি যুক্ত হয়েছে। এই দুই চালা একসঙ্গে মিলিত হয়ে একটি বিশেষ স্থাপত্যরীতি তৈরি করেছে। এই কারণেই এর নাম হয়েছে ‘জোড় বাংলা’।

মন্দিরটি মূলত দুটি অংশ নিয়ে গঠিত—একটি অংশ মণ্ডপ এবং অন্যটি গর্ভগৃহ হিসেবে ব্যবহৃত হওয়ার স্থাপত্য বৈশিষ্ট্য দেখা যায়। ইটের তৈরি মন্দিরটির সম্মুখভাগে রয়েছে তিনটি অর্ধবৃত্তাকার খিলানযুক্ত প্রবেশপথ।

পোড়ামাটির কারুকাজ

জোড় বাংলা মন্দিরের সবচেয়ে আকর্ষণীয় বৈশিষ্ট্যগুলোর একটি হলো এর টেরাকোটা বা পোড়ামাটির অলংকরণ।

মন্দিরের বিভিন্ন অংশে একসময় রামায়ণ ও অন্যান্য ধর্মীয় কাহিনির বিভিন্ন দৃশ্য ফুটিয়ে তোলা হয়েছিল বলে গবেষণায় উল্লেখ পাওয়া যায়। বিশেষ করে রাম ও রাবণের বাহিনীর যুদ্ধের দৃশ্যের টেরাকোটা ফলক মন্দিরটির অন্যতম বৈশিষ্ট্য ছিল। সময়ের সঙ্গে অনেক ফলক ক্ষতিগ্রস্ত বা নষ্ট হয়ে গেছে।

এছাড়া ফুল, লতাপাতা, জ্যামিতিক নকশা ও বিভিন্ন অলংকারধর্মী নকশায় ইটের গায়ে যে কারুকাজ করা হয়েছে, তা তৎকালীন বাংলার শিল্পীদের দক্ষতার পরিচয় বহন করে।

গোপীনাথ মন্দির নামেও পরিচিত

ঐতিহাসিকভাবে মন্দিরটি গোপীনাথ মন্দির নামেও পরিচিত ছিল। রাধারমণ সাহার পাবনা জেলার ইতিহাস গ্রন্থের তথ্য অনুযায়ী, এখানে গোপীনাথের মূর্তি ছিল এবং নিয়মিত পূজার্চনা হতো। রাধা-কৃষ্ণের মূর্তি থাকার কথাও বিভিন্ন সূত্রে উল্লেখ করা হয়েছে।

জানা যায়, ১৯১০ সালে গোপীনাথের মূর্তিটি স্থানীয় একটি কালী মন্দিরে সরিয়ে নেওয়া হয়। এরপর মন্দিরটির ধর্মীয় ব্যবহারের ইতিহাসেও পরিবর্তন আসে।

১৮৯৭ সালের ভূমিকম্পের ক্ষতচিহ্ন

১৮৯৭ সালের ভয়াবহ ভূমিকম্পের প্রভাব এই মন্দিরেও পড়েছিল বলে বিভিন্ন গবেষণামূলক সূত্রে উল্লেখ পাওয়া যায়। ভূমিকম্পে মন্দিরের কিছু অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল। পরবর্তী সময়ে সময়ের প্রভাবে স্থাপনাটির দেয়াল, স্তম্ভ ও পোড়ামাটির অলংকরণেও ক্ষয় দেখা দেয়।

সংরক্ষণে প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর

দীর্ঘ সময় অবহেলা ও ক্ষয়ের পর মন্দিরটি সংরক্ষণের উদ্যোগ নেওয়া হয়। সরকারি তথ্য অনুযায়ী, প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর এই ঐতিহাসিক স্থাপনাটিকে প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন হিসেবে সংরক্ষণ করছে এবং বিভিন্ন সময়ে সংস্কারকাজও হয়েছে।

পাবনা জেলা প্রশাসনের তথ্য অনুযায়ী, মন্দিরটি দক্ষিণ রাঘবপুরের ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় একটি পুকুরের কাছে অবস্থিত। চারপাশে বসতি গড়ে ওঠায় বর্তমানে বাইরের প্রধান সড়ক থেকে স্থাপনাটি সহজে চোখে পড়ে না।

ইতিহাসের নীরব সাক্ষী

শত বছরের পর শত বছর ধরে নানা পরিবর্তনের সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে পাবনার জোড় বাংলা মন্দির। এর দেয়ালে থাকা পোড়ামাটির কারুকাজ, দোচালা স্থাপত্য এবং নির্মাণশৈলী আমাদের সামনে তুলে ধরে বাংলার প্রাচীন শিল্প-সংস্কৃতির একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়।

নির্মাণের সুনির্দিষ্ট সাল নিয়ে মতভেদ থাকলেও একটি বিষয়ে কোনো সন্দেহ নেই—পাবনার জোড় বাংলা মন্দির জেলার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক ও প্রত্নতাত্ত্বিক সম্পদ।

নগরায়ন ও সময়ের ক্ষয় থেকে এই স্থাপনাটিকে রক্ষা করা গেলে ভবিষ্যৎ প্রজন্মও কাছ থেকে দেখতে পারবে বাংলার ঐতিহ্যবাহী জোড়-বাংলা স্থাপত্যের এই অনন্য নিদর্শন।

তথ্যসূত্র: বাংলাদেশ প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর, পাবনা জেলা প্রশাসন ও পাবনা সদর উপজেলা প্রশাসনের প্রকাশিত তথ্য।

আরো সংবাদ

কমেন্ট করুন

Please enter your comment!
Please enter your name here

- Advertisment -
Google search engine

সর্বশেষ