পাবনা প্রতিনিধি | Our Pabna24
পাবনা মানসিক হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে আসা রোগী ও তাঁদের স্বজনদের দুর্ভোগ যেন দীর্ঘদিনের সঙ্গী। হাসপাতাল প্রতিষ্ঠার প্রায় সাত দশক পেরিয়ে গেলেও বহির্বিভাগে রোগী ও স্বজনদের জন্য গড়ে ওঠেনি কোনো বিশ্রামাগার। ফলে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে চিকিৎসা নিতে আসা মানুষকে অপেক্ষা করতে হচ্ছে খোলা মাঠে, গাছতলায় কিংবা বহির্বিভাগের সামনে গাদাগাদি করে। দূরদূরান্ত থেকে আসা অনেক স্বজনকে রাত কাটাতে হচ্ছে রেলস্টেশন বা আশপাশের বারান্দায়।
১৯৫৭ সালে প্রতিষ্ঠিত ৫০০ শয্যাবিশিষ্ট পাবনা মানসিক হাসপাতালের বহির্বিভাগে প্রতিদিন দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে গড়ে ১০০ থেকে ১৫০ জন রোগী চিকিৎসা নিতে আসেন। কিন্তু রোগীর তুলনায় প্রয়োজনীয় অবকাঠামো ও অপেক্ষার জায়গার ঘাটতি থাকায় ভোগান্তিতে পড়তে হচ্ছে তাঁদের সঙ্গে আসা স্বজনদেরও।
হাসপাতালের বহির্বিভাগের কার্যক্রম চলছে পুরোনো একটি ছোট ভবনে। সেখানে চিকিৎসকের কাছে রোগী দেখানোর জন্য অপেক্ষা করার সময় স্বজনদের বসা কিংবা বিশ্রাম নেওয়ার পর্যাপ্ত ব্যবস্থা নেই। বিশেষ করে দূরের জেলা থেকে আসা বয়স্ক ব্যক্তি, নারী ও অসুস্থ রোগীদের নিয়ে আসা স্বজনদের জন্য পরিস্থিতি আরও কঠিন হয়ে ওঠে।
রাত কাটে স্টেশন কিংবা বারান্দায়
সম্প্রতি বরিশালের মেহেন্দীগঞ্জ থেকে মানসিক রোগে আক্রান্ত ছেলেকে নিয়ে পাবনা মানসিক হাসপাতালে চিকিৎসা করাতে আসেন বয়োবৃদ্ধ আবদুল লতিফ। রাতে পাবনায় পৌঁছালেও থাকার উপযুক্ত জায়গা না পেয়ে তাঁকে ছেলেকে নিয়ে হাসপাতালসংলগ্ন পুলিশ ফাঁড়ির বারান্দায় রাত কাটাতে হয়। পরদিন সকালে ছেলেকে নিয়ে বহির্বিভাগে চিকিৎসা নিতে যান তিনি।
একই ধরনের দুর্ভোগের কথা জানিয়েছেন খুলনার দিঘলিয়া থেকে আসা পরিমল কুমার মণ্ডল। রাতে ট্রেনে ঈশ্বরদী জংশনে পৌঁছে রোগীকে নিয়ে স্টেশনেই রাত কাটাতে হয় তাঁদের। সকালে হাসপাতালে এসে দেখেন, অপেক্ষা করার মতো উপযুক্ত বিশ্রামের জায়গা নেই।
মাগুরা থেকে রোগী নিয়ে আসা সাইফুল ইসলামও দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে হাসপাতালে এসে বসার ও বিশ্রামের ব্যবস্থা না পেয়ে হতাশার কথা জানিয়েছেন। তাঁদের মতো দূরদূরান্ত থেকে আসা অনেক স্বজনকে রোগীর চিকিৎসার পাশাপাশি থাকা, খাওয়া ও বিশ্রামের ব্যবস্থা করতে গিয়ে বাড়তি দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে।
বিশ্রামাগার না থাকার কথা স্বীকার কর্তৃপক্ষের
পাবনা মানসিক হাসপাতালের আবাসিক মনোরোগ চিকিৎসক এ কে এম শফিউল আযম বহির্বিভাগে চিকিৎসা নিতে আসা রোগী ও তাঁদের স্বজনদের বিশ্রাম বা থাকার ব্যবস্থা না থাকার বিষয়টি স্বীকার করেছেন।
তিনি জানান, পাবনা মানসিক হাসপাতালকে আন্তর্জাতিক মানের প্রতিষ্ঠানে রূপান্তরের পরিকল্পনা রয়েছে। এ পরিকল্পনার আওতায় রোগীদের জন্য পৃথক ওয়ার্ড এবং তাঁদের স্বজনদের জন্য আলাদা হলরুম বা ডরমিটরি নির্মাণের বিষয়টি বিবেচনায় রয়েছে।
তবে পরিকল্পনাটি বাস্তবায়িত না হওয়া পর্যন্ত বর্তমান দুর্ভোগ থেকে রোগী ও তাঁদের স্বজনদের মুক্তি মিলবে কি না, তা নিয়ে অনিশ্চয়তা থেকেই যাচ্ছে।
প্রয়োজন রোগীবান্ধব অবকাঠামো
মানসিক স্বাস্থ্যসেবা নিতে আসা মানুষের জন্য শুধু চিকিৎসকের পরামর্শ ও ওষুধ নিশ্চিত করাই যথেষ্ট নয়; চিকিৎসা গ্রহণের পুরো প্রক্রিয়াকে সহজ ও মানবিক করাও জরুরি। বিশেষ করে দূরবর্তী জেলা থেকে আসা রোগী ও তাঁদের স্বজনদের জন্য নিরাপদ অপেক্ষাকক্ষ, পর্যাপ্ত বসার জায়গা, বিশুদ্ধ পানির ব্যবস্থা এবং প্রয়োজন অনুযায়ী স্বল্প খরচে রাতযাপনের সুবিধা থাকা প্রয়োজন।
পাবনা মানসিক হাসপাতালের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিশেষায়িত প্রতিষ্ঠানে রোগীর স্বজনদের জন্য একটি সুশৃঙ্খল বিশ্রামাগার নির্মাণ সময়ের দাবি। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ দ্রুত কার্যকর উদ্যোগ নিলে চিকিৎসা নিতে আসা মানুষদের দীর্ঘদিনের দুর্ভোগ অনেকটাই কমানো সম্ভব হবে।


