ভূমিকা : মানুষের জীবনে আইন ও বিধানের প্রয়োজন অপরিসীম। সমাজে শান্তি, ন্যায়বিচার ও শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠার জন্য মানুষ বিভিন্ন সময় বিভিন্ন আইন প্রণয়ন করেছে। কিন্তু মানুষের তৈরি আইন পরিবর্তনশীল। সময়, পরিস্থিতি, রাজনৈতিক বাস্তবতা কিংবা মানুষের চিন্তাধারার পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে এসব আইনে সংশোধন, সংযোজন ও পরিবর্তন আসে। পক্ষান্তরে আল্লাহ তায়ালার বিধান মানুষের তৈরি কোনো বিধান নয়; এটি সর্বজ্ঞ, সর্বশক্তিমান ও প্রজ্ঞাময় সৃষ্টিকর্তার পক্ষ থেকে অবতীর্ণ। তাই আল্লাহর আইন কোনো যুগের আবেগ, মানুষের পছন্দ-অপছন্দ কিংবা সংখ্যাগরিষ্ঠের মতামতের ওপর নির্ভরশীল নয়।
আল্লাহ তায়ালা বলেন—
إِنِ الْحُكْمُ إِلَّا لِلَّهِ
“হুকুম বা বিধান দেওয়ার অধিকার একমাত্র আল্লাহর।”
—সূরা ইউসুফ: ৪০
এই আয়াত আমাদের একটি মৌলিক সত্য শিক্ষা দেয়—চূড়ান্ত বিধানদানের অধিকার আল্লাহর। তিনি কোনো বিষয়কে হালাল করলে তা হালাল এবং কোনো বিষয়কে হারাম করলে তা হারাম। কোনো বিধান ছোট বিষয়কে কেন্দ্র করে হোক কিংবা বড় কোনো বিষয়কে কেন্দ্র করে হোক, একজন মুমিনের কাছে আল্লাহর নির্দেশের মর্যাদা একই।
আল্লাহর বিধানের ভিত্তি হলো পূর্ণ জ্ঞান ও প্রজ্ঞা
মানুষ সীমিত জ্ঞানের অধিকারী। আজ যে বিষয়কে মানুষ কল্যাণকর মনে করে, ভবিষ্যতে সেটির ক্ষতিকর দিক প্রকাশ পেতে পারে। আবার কোনো বিষয়কে মানুষ ক্ষতিকর মনে করলেও তার মধ্যে এমন কল্যাণ থাকতে পারে, যা মানুষের সীমিত জ্ঞান দিয়ে উপলব্ধি করা সম্ভব নয়।
আল্লাহ বলেন—
أَلَا يَعْلَمُ مَنْ خَلَقَ وَهُوَ اللَّطِيفُ الْخَبِيرُ
“যিনি সৃষ্টি করেছেন, তিনি কি জানেন না? অথচ তিনি অতি সূক্ষ্মদর্শী, সর্বজ্ঞ।”
—সূরা আল-মুলক: ১৪
সুতরাং আল্লাহর কোনো বিধান আমাদের কাছে ছোট মনে হলেও সেটি তুচ্ছ নয়। কারণ বিধানের গুরুত্ব নির্ধারিত হয় বিষয়টির আকার দিয়ে নয়; বরং বিধানদাতার মর্যাদা দিয়ে।
ছোট বিষয়েও আল্লাহর আনুগত্য অপরিহার্য
ইসলামে এমন অনেক বিষয় রয়েছে, যেগুলো বাহ্যিকভাবে ছোট মনে হতে পারে; কিন্তু সেগুলোতেও রাসুলুল্লাহ ﷺ-এর নির্দেশ রয়েছে। পোশাক, খাদ্য, পরিচ্ছন্নতা, লেনদেন, পারিবারিক জীবন, কথা বলার আদব—এসবের অনেক বিষয় হয়তো মানুষের চোখে ছোট; কিন্তু একজন মুমিন এগুলোতেও আল্লাহ ও রাসুলের নির্দেশ অনুসরণ করেন।
কারণ মুমিনের অবস্থান হলো—“বিধানটি কত বড়?”—এ প্রশ্ন নয়; বরং “বিধানটি কার?”—এটাই মূল প্রশ্ন।
আল্লাহ তায়ালা বলেন—
وَمَا كَانَ لِمُؤْمِنٍ وَلَا مُؤْمِنَةٍ إِذَا قَضَى اللَّهُ وَرَسُولُهُ أَمْرًا أَنْ يَكُونَ لَهُمُ الْخِيَرَةُ مِنْ أَمْرِهِمْ
“আল্লাহ ও তাঁর রাসুল কোনো বিষয়ে সিদ্ধান্ত দিলে কোনো মুমিন পুরুষ কিংবা মুমিন নারীর সে বিষয়ে নিজস্ব সিদ্ধান্ত গ্রহণের অধিকার থাকে না।”
—সূরা আল-আহযাব: ৩৬
এখানে লক্ষ্য করার বিষয় হলো, আল্লাহ ও রাসুল ﷺ কোনো বিষয়ে সিদ্ধান্ত দেওয়ার পর মুমিনের কাজ হলো তা মেনে নেওয়া। নিজের পছন্দ অনুযায়ী কোনো বিধান গ্রহণ করা আর কোনোটি প্রত্যাখ্যান করা ঈমানের পূর্ণতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।
বড় বিধানেও যেমন আনুগত্য, ছোট বিধানেও তেমনই
নামাজ, রোজা, হজ ও যাকাত ইসলামের গুরুত্বপূর্ণ বিধান। এগুলোর ব্যাপারে মুসলমানেরা সাধারণত অত্যন্ত সচেতন। কিন্তু ইসলাম শুধু বড় বড় ইবাদতের নাম নয়। ইসলাম মানুষের জীবনের ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র বিষয়েও আল্লাহর নির্দেশনা দিয়েছে।
যেমন—মিথ্যা বলা নিষিদ্ধ, প্রতারণা নিষিদ্ধ, সুদ নিষিদ্ধ, অন্যের সম্পদ অন্যায়ভাবে ভক্ষণ নিষিদ্ধ, গীবত নিষিদ্ধ, আমানতের খেয়ানত নিষিদ্ধ। এগুলোর কোনোটি মানুষের চোখে ছোট মনে হলেও আল্লাহর কাছে তা ছোট নয়।
আবার কোনো বিধান যদি আমাদের ব্যক্তিগত স্বার্থের বিরুদ্ধে যায়, তখনও মুমিনের পরীক্ষা হয়। নিজের সুবিধার সময় আল্লাহর বিধান মানা সহজ; কিন্তু নিজের স্বার্থ ক্ষতিগ্রস্ত হলেও আল্লাহর বিধানকে অগ্রাধিকার দেওয়া হলো প্রকৃত আনুগত্যের পরিচয়।
আল্লাহর বিধান নিয়ে পছন্দ-অপছন্দের মানদণ্ড হতে পারে না
বর্তমান সময়ে অনেক মানুষ কোনো বিধানকে নিজের সুবিধার সঙ্গে মিললে গ্রহণ করতে চান, আর অসুবিধা হলে তা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। অথচ ঈমানের দাবি হলো—আল্লাহর বিধানকে নিজের প্রবৃত্তির অধীন করা নয়; বরং নিজের প্রবৃত্তিকে আল্লাহর বিধানের অধীন করা।
আল্লাহ বলেন—
فَلَا وَرَبِّكَ لَا يُؤْمِنُونَ حَتَّىٰ يُحَكِّمُوكَ فِيمَا شَجَرَ بَيْنَهُمْ
“আপনার রবের কসম! তারা মুমিন হবে না, যতক্ষণ না তাদের পারস্পরিক বিরোধের ক্ষেত্রে আপনাকে বিচারক হিসেবে গ্রহণ করে।”
—সূরা আন-নিসা: ৬৫
অর্থাৎ একজন প্রকৃত মুমিনের কাছে আল্লাহ ও রাসুল ﷺ-এর নির্দেশই চূড়ান্ত মানদণ্ড।
সময় পরিবর্তন হয়, কিন্তু আল্লাহর সত্য পরিবর্তন হয় না
যুগ পরিবর্তিত হয়েছে, প্রযুক্তি পরিবর্তিত হয়েছে, মানুষের জীবনযাত্রা পরিবর্তিত হয়েছে। কিন্তু সত্য-মিথ্যা, ন্যায়-অন্যায়, হালাল-হারামের মৌলিক নীতিগুলো মানুষের পরিবর্তিত রুচির ওপর নির্ভরশীল নয়।
আল্লাহ বলেন—
لَا مُبَدِّلَ لِكَلِمَاتِ اللَّهِ
“আল্লাহর বাণীসমূহ পরিবর্তন করার কেউ নেই।”
—সূরা আল-আনআম: ১১৫
অবশ্য শরিয়াহর মধ্যে এমন কিছু বিধান রয়েছে, যেগুলো পরিস্থিতি, প্রমাণ, ইজতিহাদ ও প্রয়োগের ক্ষেত্র অনুযায়ী ফিকহি ব্যাখ্যার অধীন হতে পারে। কিন্তু আল্লাহ ও তাঁর রাসুল ﷺ কর্তৃক সুস্পষ্টভাবে নির্ধারিত কোনো বিধানকে মানুষের ইচ্ছা অনুযায়ী বাতিল, পরিবর্তন বা হালাল-হারামের সীমা উল্টে দেওয়ার অধিকার মানুষের নেই।
আইন পরিবর্তনের নামে আল্লাহর বিধানকে পরিবর্তন করা যাবে না
মানুষের তৈরি আইন প্রয়োজন অনুযায়ী পরিবর্তন হতে পারে। কিন্তু কোনো মানবীয় আইন পরিবর্তনের মাধ্যমে আল্লাহর স্পষ্ট হালালকে হারাম বা হারামকে হালাল বানানোর বৈধতা সৃষ্টি হয় না। কারণ মুসলমানের কাছে সংসদ, আদালত, সমাজ কিংবা সংখ্যাগরিষ্ঠতার সিদ্ধান্তের ঊর্ধ্বে রয়েছে আল্লাহর বিধান।
তবে কোনো সমসাময়িক আইন নিয়ে আলোচনা করতে হলে জ্ঞান, প্রজ্ঞা ও শরিয়াহর নীতিমালা অনুসরণ করা জরুরি। আবেগের বশবর্তী হয়ে কোনো আইনকে “শরিয়াহবিরোধী” বলা যেমন ঠিক নয়, তেমনি আল্লাহর স্পষ্ট বিধানের বিপরীতে কোনো মানবীয় সিদ্ধান্তকে চূড়ান্ত সত্য হিসেবে গ্রহণ করাও একজন মুমিনের জন্য গ্রহণযোগ্য নয়।
উপসংহার
আল্লাহর আইন ছোট হোক কিংবা বড়—তার মর্যাদা একজন মুমিনের কাছে সমান। কারণ বিধানের মূল্য নির্ধারিত হয় তার আকার দিয়ে নয়; বরং বিধানদাতা আল্লাহ তায়ালার মহত্ত্ব দিয়ে।
একজন মুমিনের প্রকৃত পরিচয় হলো—আল্লাহর নির্দেশ নিজের সুবিধা অনুযায়ী বেছে নেওয়া নয়; বরং আল্লাহর নির্দেশকে নিজের জীবনের মানদণ্ড হিসেবে গ্রহণ করা। যে বিধান বুঝতে সহজ, সেটিও মানবে; যে বিধান নিজের স্বার্থের বিরুদ্ধে যায়, সেটিও মানবে। যে বিধান বড়, সেটিও মানবে; যে বিধান বাহ্যিকভাবে ছোট, সেটিও সম্মানের সঙ্গে মানবে।
কারণ আল্লাহর বিধানের সামনে মুমিনের অবস্থান হলো—
سَمِعْنَا وَأَطَعْنَا
“আমরা শুনলাম এবং আনুগত্য করলাম।”
আল্লাহ তায়ালা আমাদেরকে তাঁর বিধানকে সম্মান করার, বুঝার এবং জীবনের সর্বক্ষেত্রে যথাসাধ্য বাস্তবায়ন করার তাওফিক দান করুন। আমিন।
লেখক : মুফতী মুক্তাদির হোসাইন মারুফ (খতীব, সম্পাদক ও মুহতামিম)


