Google search engine
Homeইসলামরাসুলুল্লাহ ﷺ-এর নবুয়ত

রাসুলুল্লাহ ﷺ-এর নবুয়ত

ভূমিকা : মানবজাতির হেদায়াতের জন্য মহান আল্লাহ যুগে যুগে অসংখ্য নবী-রাসুল প্রেরণ করেছেন। তাঁরা মানুষকে এক আল্লাহর ইবাদত, ন্যায়-নীতি, সত্যবাদিতা ও উত্তম চরিত্রের শিক্ষা দিয়েছেন। সেই ধারাবাহিকতার সর্বশেষ নবী ও রাসুল হলেন হযরত মুহাম্মদ মুস্তফা ﷺ। তাঁর মাধ্যমে নবুয়তের ধারার পরিসমাপ্তি ঘটেছে। আল্লাহ তাআলা তাঁকে সমগ্র মানবজাতির জন্য রহমত, পথপ্রদর্শক ও আদর্শ হিসেবে প্রেরণ করেছেন। তাঁর নবুয়ত মানব ইতিহাসের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ও তাৎপর্যপূর্ণ ঘটনাগুলোর একটি।

নবুয়তের পূর্বে আরবের অবস্থা

রাসুলুল্লাহ ﷺ-এর নবুয়তের পূর্বে আরব সমাজ নানা ধরনের অজ্ঞতা, কুসংস্কার ও অনাচারে নিমজ্জিত ছিল। তারা মূর্তিপূজায় লিপ্ত ছিল। কাবা শরিফের চারপাশে অসংখ্য মূর্তি স্থাপন করা হয়েছিল। গোত্রীয় অহংকার, রক্তের প্রতিশোধ, সুদ, মদ, জুয়া, ব্যভিচার ও নানা সামাজিক অনাচার ব্যাপকভাবে প্রচলিত ছিল। নারীদের প্রতি অবিচার করা হতো এবং কোনো কোনো গোত্র কন্যাসন্তানকে জীবন্ত কবর দিত।

আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন—

وَإِذَا الْمَوْءُودَةُ سُئِلَتْ ۝ بِأَيِّ ذَنْبٍ قُتِلَتْ

“আর যখন জীবন্ত কবর দেওয়া কন্যাকে জিজ্ঞেস করা হবে—কোন অপরাধে তাকে হত্যা করা হয়েছিল?”
—সূরা আত-তাকভীর: ৮-৯

এই অন্ধকার সমাজেই আল্লাহ তাআলা সর্বশেষ নবী মুহাম্মদ ﷺ-কে পাঠানোর মাধ্যমে মানবজাতির জন্য হেদায়াতের নতুন দ্বার উন্মুক্ত করেন।

জন্ম ও শৈশব

রাসুলুল্লাহ ﷺ মক্কা নগরীতে কুরাইশ বংশে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতা আবদুল্লাহ তাঁর জন্মের আগেই ইন্তেকাল করেন। তাঁর মাতা আমিনা বিনতে ওয়াহাব। আরবের প্রচলিত রীতি অনুযায়ী শৈশবে তিনি হালিমা সাদিয়া (রা.)-এর কাছে লালিত-পালিত হন।

শৈশব থেকেই তাঁর চরিত্র ছিল অসাধারণ। তিনি কখনো মিথ্যা বলতেন না, কারও আমানতের খিয়ানত করতেন না এবং অন্যায় কাজে অংশ নিতেন না। নবুয়তের আগেই মক্কার মানুষ তাঁকে “আল-আমিন”—বিশ্বস্ত এবং “আস-সাদিক”—সত্যবাদী বলে অভিহিত করত।

নবুয়তের পূর্বপ্রস্তুতি

রাসুলুল্লাহ ﷺ চল্লিশ বছর বয়স পর্যন্ত সাধারণ মানুষের মতোই জীবনযাপন করলেও আল্লাহ তাআলা তাঁকে বিশেষভাবে প্রস্তুত করছিলেন। তিনি মূর্তিপূজা ও জাহেলি সমাজের বিভিন্ন অনাচার থেকে নিজেকে দূরে রাখতেন। মক্কার নিকটবর্তী হেরা গুহায় গিয়ে তিনি নির্জনে ইবাদত ও চিন্তা-ভাবনায় সময় কাটাতেন।

তিনি মানুষের দুঃখ-কষ্ট, সমাজের অন্যায় এবং সৃষ্টিজগতের রহস্য নিয়ে গভীরভাবে চিন্তা করতেন। এভাবেই এক মহান ঐতিহাসিক মুহূর্তের জন্য তাঁকে প্রস্তুত করা হয়।

প্রথম ওহি ও নবুয়ত লাভ

রাসুলুল্লাহ ﷺ-এর বয়স যখন চল্লিশ বছর, তখন রমজান মাসে হেরা গুহায় তাঁর কাছে প্রথম ওহি অবতীর্ণ হয়। ফেরেশতা জিবরাইল (আ.) এসে তাঁকে বলেন—

اقْرَأْ

“পড়ুন।”

তিনি বললেন—

مَا أَنَا بِقَارِئٍ

“আমি পড়তে জানি না।”

এরপর জিবরাইল (আ.) আল্লাহর পক্ষ থেকে সূরা আলাকের প্রথম পাঁচ আয়াত নিয়ে আসেন—

اقْرَأْ بِاسْمِ رَبِّكَ الَّذِي خَلَقَ ۝ خَلَقَ الْإِنسَانَ مِنْ عَلَقٍ ۝ اقْرَأْ وَرَبُّكَ الْأَكْرَمُ ۝ الَّذِي عَلَّمَ بِالْقَلَمِ ۝ عَلَّمَ الْإِنسَانَ مَا لَمْ يَعْلَمْ

অর্থ: “পড়ুন আপনার সেই প্রতিপালকের নামে, যিনি সৃষ্টি করেছেন। তিনি মানুষকে জমাট রক্তপিণ্ড থেকে সৃষ্টি করেছেন। পড়ুন, আর আপনার প্রতিপালক মহামহিমান্বিত। যিনি কলমের মাধ্যমে শিক্ষা দিয়েছেন। মানুষকে শিক্ষা দিয়েছেন যা সে জানত না।”
—সূরা আলাক: ১-৫

এই ওহির মাধ্যমেই মুহাম্মদ ﷺ আনুষ্ঠানিকভাবে আল্লাহর সর্বশেষ নবী হিসেবে দায়িত্ব লাভ করেন।

নবুয়তের দায়িত্ব

নবুয়ত লাভের পর রাসুলুল্লাহ ﷺ-এর ওপর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব ছিল মানুষকে তাওহিদের দিকে আহ্বান করা। তিনি ঘোষণা করলেন—আল্লাহ ছাড়া কোনো উপাস্য নেই এবং মুহাম্মদ ﷺ আল্লাহর রাসুল।

আল্লাহ তাআলা বলেন—

يَا أَيُّهَا النَّبِيُّ إِنَّا أَرْسَلْنَاكَ شَاهِدًا وَمُبَشِّرًا وَنَذِيرًا ۝ وَدَاعِيًا إِلَى اللَّهِ بِإِذْنِهِ وَسِرَاجًا مُّنِيرًا

“হে নবী! নিশ্চয়ই আমি আপনাকে সাক্ষী, সুসংবাদদাতা, সতর্ককারী, আল্লাহর অনুমতিক্রমে তাঁর দিকে আহ্বানকারী এবং উজ্জ্বল প্রদীপ হিসেবে প্রেরণ করেছি।”
—সূরা আল-আহযাব: ৪৫-৪৬

তিনি মানুষকে শিরক ও কুফর থেকে মুক্ত করে এক আল্লাহর ইবাদতের দিকে আহ্বান করেন। পাশাপাশি নামাজ, রোজা, যাকাত, হজ, সত্যবাদিতা, আমানতদারি, ন্যায়বিচার, পিতা-মাতার অধিকার, প্রতিবেশীর অধিকার এবং মানুষের পারস্পরিক ভালোবাসার শিক্ষা দেন।

গোপন ও প্রকাশ্য দাওয়াত

নবুয়তের প্রথম দিকে রাসুলুল্লাহ ﷺ সীমিত পরিসরে দাওয়াত দেন। সর্বপ্রথম হযরত খাদিজা (রা.), হযরত আবু বকর (রা.), হযরত আলী (রা.) এবং হযরত যায়েদ ইবনে হারিসা (রা.) ইসলাম গ্রহণ করেন।

পরবর্তীতে আল্লাহর নির্দেশে তিনি প্রকাশ্যে ইসলামের দাওয়াত শুরু করেন। কুরাইশ নেতারা তাঁর বিরোধিতা করে। তাঁকে ও তাঁর সাহাবিদের নানা ধরনের নির্যাতন করা হয়। কিন্তু রাসুলুল্লাহ ﷺ সত্যের পথে অবিচল থাকেন। তিনি প্রতিশোধের পরিবর্তে ধৈর্য, ক্ষমা ও উত্তম আচরণের দৃষ্টান্ত স্থাপন করেন।

মক্কা থেকে মদিনা

মক্কার নির্যাতন যখন চরম পর্যায়ে পৌঁছে যায়, তখন আল্লাহর নির্দেশে রাসুলুল্লাহ ﷺ মদিনায় হিজরত করেন। মদিনায় তিনি একটি আদর্শ সমাজ প্রতিষ্ঠা করেন। মুহাজির ও আনসারদের মধ্যে ভ্রাতৃত্ব প্রতিষ্ঠা করেন এবং বিভিন্ন ধর্ম ও গোত্রের মানুষের সঙ্গে শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের নীতিমালা নির্ধারণ করেন।

মদিনায় ইসলাম শুধু ব্যক্তিগত ইবাদতের বিষয় হিসেবে থাকেনি; বরং ন্যায়বিচার, অর্থনীতি, পরিবার, সমাজ, রাষ্ট্র ও মানবাধিকারের একটি পূর্ণাঙ্গ জীবনব্যবস্থা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়।

বিদায় হজ ও নবুয়তের পূর্ণতা

রাসুলুল্লাহ ﷺ তাঁর জীবনের শেষ দিকে বিদায় হজ পালন করেন। সেখানে তিনি মানুষের জীবন, সম্পদ ও সম্মানের মর্যাদা ঘোষণা করেন। সুদ ও জাহেলি যুগের রক্তের প্রতিশোধ বাতিল ঘোষণা করেন এবং নারীদের অধিকার সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশনা দেন।

তিনি ঘোষণা করেন—

فَلْيُبَلِّغِ الشَّاهِدُ الْغَائِبَ

“যারা এখানে উপস্থিত, তারা যেন অনুপস্থিতদের কাছে এ কথা পৌঁছে দেয়।”

রাসুলুল্লাহ ﷺ-এর মাধ্যমে নবুয়তের ধারার সমাপ্তি হয়েছে। আল্লাহ তাআলা বলেন—

مَّا كَانَ مُحَمَّدٌ أَبَا أَحَدٍ مِّن رِّجَالِكُمْ وَلَٰكِن رَّسُولَ اللَّهِ وَخَاتَمَ النَّبِيِّينَ

“মুহাম্মদ তোমাদের কোনো পুরুষের পিতা নন; বরং তিনি আল্লাহর রাসুল এবং সর্বশেষ নবী।”
—সূরা আল-আহযাব: ৪০

উপসংহার

রাসুলুল্লাহ ﷺ-এর নবুয়ত ছিল সমগ্র মানবজাতির জন্য আল্লাহর পক্ষ থেকে সর্বশ্রেষ্ঠ অনুগ্রহ। তাঁর আগমনে পৃথিবী শিরক ও জাহেলিয়াতের অন্ধকার থেকে তাওহিদ ও হেদায়াতের আলোয় আলোকিত হয়। তিনি শুধু একজন ধর্মীয় নেতা ছিলেন না; তিনি ছিলেন শিক্ষক, সংস্কারক, রাষ্ট্রনায়ক, বিচারক, আদর্শ স্বামী, আদর্শ পিতা এবং সর্বোপরি আল্লাহর সর্বশেষ রাসুল।

তাঁর জীবন আমাদের জন্য পূর্ণাঙ্গ আদর্শ। আল্লাহ তাআলা বলেন—

لَقَدْ كَانَ لَكُمْ فِي رَسُولِ اللَّهِ أُسْوَةٌ حَسَنَةٌ

“নিশ্চয়ই তোমাদের জন্য আল্লাহর রাসুলের মধ্যে রয়েছে উত্তম আদর্শ।”
—সূরা আল-আহযাব: ২১

তাই রাসুলুল্লাহ ﷺ-এর নবুয়তের প্রতি ঈমান আনা, তাঁকে ভালোবাসা, তাঁর সুন্নাহ অনুসরণ করা এবং তাঁর আদর্শ অনুযায়ী জীবন পরিচালনা করা প্রত্যেক মুসলমানের দায়িত্ব। তাঁর রেখে যাওয়া কুরআন ও সুন্নাহর আলোকে জীবন পরিচালনা করলেই ব্যক্তি, পরিবার ও সমাজ সত্যিকার অর্থে শান্তি ও কল্যাণ লাভ করতে পারে।

আরো সংবাদ

কমেন্ট করুন

Please enter your comment!
Please enter your name here

- Advertisment -
Google search engine

সর্বশেষ