ভূমিকা : সমস্ত প্রশংসা মহান আল্লাহ তাআলার জন্য, যিনি মানবজাতির হেদায়াতের জন্য যুগে যুগে নবী-রাসুল প্রেরণ করেছেন। তাঁদের মধ্যে সর্বশেষ ও সর্বশ্রেষ্ঠ নবী হলেন হযরত মুহাম্মদ ﷺ। তিনি এমন এক সময়ে পৃথিবীতে আগমন করেন, যখন আরব সমাজ অজ্ঞতা, শিরক, কুসংস্কার, জুলুম, অশ্লীলতা, গোত্রীয় হিংসা ও নৈতিক অবক্ষয়ে নিমজ্জিত ছিল। সেই অন্ধকার যুগে আল্লাহ তাআলা তাঁকে সমগ্র মানবজাতির জন্য রহমত ও হেদায়াতের দূত হিসেবে প্রেরণ করেন।
আল্লাহ তাআলা বলেন—
﴿وَمَا أَرْسَلْنَاكَ إِلَّا كَافَّةً لِّلنَّاسِ بَشِيرًا وَنَذِيرًا﴾
“আমি আপনাকে সমগ্র মানবজাতির জন্য সুসংবাদদাতা ও সতর্ককারী হিসেবে প্রেরণ করেছি।”
—সূরা সাবা: ২৮
ওহি ও দাওয়াতের সূচনা
রাসুলুল্লাহ ﷺ-এর বয়স যখন চল্লিশ বছর, তখন তিনি মক্কার নিকটবর্তী হেরা গুহায় নির্জনে ইবাদত ও চিন্তা-ভাবনায় সময় কাটাতেন। ৬১০ খ্রিস্টাব্দে রমজান মাসে তাঁর ওপর প্রথম ওহি নাজিল হয়। হযরত জিবরাইল (আ.) এসে তাঁকে বলেন—
اقْرَأْ
“পড়ুন।”
এরপর সূরা আলাকের প্রথম পাঁচ আয়াত নাজিল হয়—
﴿اقْرَأْ بِاسْمِ رَبِّكَ الَّذِي خَلَقَ خَلَقَ الْإِنسَانَ مِنْ عَلَقٍ اقْرَأْ وَرَبُّكَ الْأَكْرَمُ الَّذِي عَلَّمَ بِالْقَلَمِ عَلَّمَ الْإِنسَانَ مَا لَمْ يَعْلَمْ﴾
অর্থ: “পড়ুন আপনার সেই রবের নামে, যিনি সৃষ্টি করেছেন। তিনি মানুষকে জমাট রক্ত থেকে সৃষ্টি করেছেন। পড়ুন, আর আপনার রব মহামহিমান্বিত। যিনি কলমের মাধ্যমে শিক্ষা দিয়েছেন। মানুষকে শিক্ষা দিয়েছেন যা সে জানত না।”
প্রথম ওহির পর রাসুলুল্লাহ ﷺ-এর ওপর একটি মহান দায়িত্ব অর্পিত হয়—মানুষকে এক আল্লাহর ইবাদতের দিকে আহ্বান করা, শিরক ও কুফর থেকে সতর্ক করা এবং সুন্দর চরিত্র ও ন্যায়-ইনসাফের শিক্ষা দেওয়া।
গোপনে দাওয়াত
প্রথম দিকে রাসুলুল্লাহ ﷺ প্রকাশ্যে ব্যাপকভাবে দাওয়াত না দিয়ে অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে নিকটজন ও বিশ্বস্ত ব্যক্তিদের মধ্যে দাওয়াতের কাজ শুরু করেন। সর্বপ্রথম ঈমান গ্রহণ করেন তাঁর স্ত্রী হযরত খাদিজা (রা.)। এরপর হযরত আবু বকর সিদ্দিক (রা.), হযরত আলী (রা.) এবং হযরত যায়েদ ইবনে হারিসা (রা.) ইসলাম গ্রহণ করেন।
হযরত আবু বকর (রা.)-এর দাওয়াতের মাধ্যমে উসমান ইবনে আফফান (রা.), যুবাইর ইবনে আওয়াম (রা.), তালহা ইবনে উবাইদুল্লাহ (রা.), সা‘দ ইবনে আবি ওয়াক্কাস (রা.) প্রমুখ সাহাবি ইসলাম গ্রহণ করেন।
এভাবে ইসলামের প্রথম পর্যায়ে অল্পসংখ্যক মানুষ ঈমান গ্রহণ করলেও তাঁদের ঈমান ছিল অত্যন্ত দৃঢ়। তাঁরা ছিলেন নবী ﷺ-এর দাওয়াতের প্রথম সারির সৈনিক।
প্রকাশ্য দাওয়াত
গোপন দাওয়াতের প্রায় তিন বছর পর আল্লাহ তাআলা তাঁর রাসুল ﷺ-কে প্রকাশ্যে দাওয়াত দেওয়ার নির্দেশ দেন। আল্লাহ বলেন—
﴿فَاصْدَعْ بِمَا تُؤْمَرُ وَأَعْرِضْ عَنِ الْمُشْرِكِينَ﴾
“আপনাকে যে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে তা প্রকাশ্যে ঘোষণা করুন এবং মুশরিকদের উপেক্ষা করুন।”
—সূরা আল-হিজর: ৯৪
আরেক আয়াতে আল্লাহ বলেন—
﴿وَأَنذِرْ عَشِيرَتَكَ الْأَقْرَبِينَ﴾
“আপনার নিকটাত্মীয়দের সতর্ক করুন।”
—সূরা আশ-শুআরা: ২১৪
রাসুলুল্লাহ ﷺ এরপর সাফা পাহাড়ে উঠে কুরাইশদের আহ্বান করেন এবং তাঁদের এক আল্লাহর ইবাদতের দিকে ডাকেন। তিনি তাঁদের স্মরণ করিয়ে দেন যে, তিনি তাঁদের কাছে বিশ্বস্ত ও সত্যবাদী হিসেবে পরিচিত। কিন্তু সত্যের এই আহ্বান কুরাইশ নেতাদের কাছে কঠিন মনে হলো।
দাওয়াতের পথে প্রথম প্রতিবন্ধকতা—শিরক ও অজ্ঞতা
রাসুল ﷺ-এর দাওয়াতের মূল বক্তব্য ছিল—লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ, অর্থাৎ আল্লাহ ছাড়া কোনো উপাস্য নেই। মক্কার অধিকাংশ মানুষ তখন বিভিন্ন মূর্তির পূজা করত। তারা পূর্বপুরুষদের ধর্ম ও রীতিনীতি আঁকড়ে ধরে ছিল।
আল্লাহ বলেন—
﴿إِنَّا وَجَدْنَا آبَاءَنَا عَلَىٰ أُمَّةٍ وَإِنَّا عَلَىٰ آثَارِهِم مُّهْتَدُونَ﴾
“আমরা আমাদের পূর্বপুরুষদের একটি মতের ওপর পেয়েছি এবং আমরা তাদের পদাঙ্ক অনুসরণ করছি।”
—সূরা যুখরুফ: ২২
অর্থাৎ সত্য বোঝার পরিবর্তে তারা অন্ধভাবে পূর্বপুরুষদের অনুসরণ করেছিল।
দ্বিতীয় প্রতিবন্ধকতা—অহংকার ও নেতৃত্ব হারানোর ভয়
কুরাইশের নেতারা বুঝতে পারল, ইসলাম প্রতিষ্ঠিত হলে তাদের ধর্মীয় ও সামাজিক কর্তৃত্ব প্রশ্নের মুখে পড়বে। তাই তারা নবী ﷺ-এর বিরুদ্ধে নানা ধরনের ষড়যন্ত্র শুরু করে। তাঁকে কখনো কবি, কখনো জাদুকর, কখনো পাগল বলে অপবাদ দেওয়া হয়।
আল্লাহ তাআলা এসব অপবাদ খণ্ডন করে বলেন—
﴿مَا أَنتَ بِنِعْمَةِ رَبِّكَ بِمَجْنُونٍ﴾
“আপনার রবের অনুগ্রহে আপনি পাগল নন।”
—সূরা আল-কলম: ২
তৃতীয় প্রতিবন্ধকতা—নির্যাতন ও শারীরিক কষ্ট
ইসলামের অনুসারীদের ওপর ভয়াবহ নির্যাতন চালানো হয়। বিশেষ করে দুর্বল ও দাস সাহাবিদের ওপর নির্মম অত্যাচার করা হয়। হযরত বিলাল (রা.)-কে উত্তপ্ত বালুর ওপর শুইয়ে নির্যাতন করা হতো। তাঁকে ঈমান ত্যাগ করতে বলা হলেও তিনি দৃঢ়ভাবে বলতেন—
أَحَدٌ أَحَدٌ
“এক, এক”—অর্থাৎ আল্লাহ এক।
হযরত খাব্বাব (রা.)সহ অনেক সাহাবিকে বিভিন্নভাবে নির্যাতন করা হয়। কিন্তু তাঁদের ঈমান টলানো যায়নি।
চতুর্থ প্রতিবন্ধকতা—সামাজিক বয়কট
কুরাইশ যখন দেখল নির্যাতন করেও মুসলমানদের দাওয়াত বন্ধ করা যাচ্ছে না, তখন তারা বনি হাশিম ও বনি মুত্তালিবের বিরুদ্ধে সামাজিক ও অর্থনৈতিক বয়কট আরোপ করে। মুসলমান ও রাসুল ﷺ-এর পরিবারকে শি‘বে আবি তালিবে দীর্ঘ সময় কঠিন অবস্থার মধ্যে থাকতে হয়। খাদ্যাভাব ও দুঃখ-কষ্টের মধ্যেও রাসুল ﷺ দাওয়াতের কাজ অব্যাহত রাখেন।
পঞ্চম প্রতিবন্ধকতা—প্রলোভন ও আপসের প্রস্তাব
কুরাইশ একদিকে নির্যাতন করেছে, অন্যদিকে রাসুল ﷺ-কে বিভিন্ন প্রলোভনও দিয়েছে। তাঁকে সম্পদ, নেতৃত্ব ও সম্মান দেওয়ার প্রস্তাব দেওয়া হয়, যাতে তিনি দাওয়াতের কাজ ছেড়ে দেন। কিন্তু রাসুল ﷺ কোনো পার্থিব স্বার্থের জন্য আল্লাহর দীন থেকে একচুলও সরে যাননি।
তিনি বুঝিয়ে দিয়েছেন—সত্যের দাওয়াত কোনো ব্যক্তিগত লাভের বিষয় নয়; এটি আল্লাহর পক্ষ থেকে অর্পিত দায়িত্ব।
রাসুল ﷺ-এর দাওয়াতের পদ্ধতি
রাসুলুল্লাহ ﷺ-এর দাওয়াত ছিল প্রজ্ঞা, ধৈর্য, কোমলতা ও উত্তম চরিত্রের সমন্বয়। আল্লাহ বলেন—
﴿ادْعُ إِلَىٰ سَبِيلِ رَبِّكَ بِالْحِكْمَةِ وَالْمَوْعِظَةِ الْحَسَنَةِ﴾
“আপনার রবের পথে প্রজ্ঞা ও উত্তম উপদেশের মাধ্যমে আহ্বান করুন।”
—সূরা আন-নাহল: ১২৫
তিনি মানুষের সঙ্গে কোমল আচরণ করতেন, তাদের কথা শুনতেন এবং যুক্তি ও সুন্দর উপদেশের মাধ্যমে সত্যের দিকে আহ্বান করতেন।
উপসংহার
রাসুলুল্লাহ ﷺ-এর দাওয়াতের সূচনা হয়েছিল একজন মানুষ দিয়ে, এরপর একটি পরিবার, একটি ছোট দল এবং ধীরে ধীরে সমগ্র মানবজাতির জন্য একটি পূর্ণাঙ্গ জীবনব্যবস্থায় পরিণত হয়। এই দাওয়াতের পথে ছিল শিরক, অজ্ঞতা, অহংকার, নির্যাতন, সামাজিক বয়কট, অপপ্রচার ও নানা প্রলোভন। কিন্তু রাসুল ﷺ ও তাঁর সাহাবায়ে কেরাম কোনো বাধার কাছে আত্মসমর্পণ করেননি।
তাঁদের জীবন আমাদের শিক্ষা দেয়—সত্যের দাওয়াতের পথে প্রতিবন্ধকতা আসবেই। তাই একজন দাঈর প্রয়োজন ইখলাস, ইলম, হিকমাহ, সবর ও উত্তম চরিত্র। আল্লাহ তাআলা বলেন—
﴿وَمَنْ أَحْسَنُ قَوْلًا مِّمَّن دَعَا إِلَى اللَّهِ وَعَمِلَ صَالِحًا وَقَالَ إِنَّنِي مِنَ الْمُسْلِمِينَ﴾
“তার চেয়ে উত্তম কথা আর কার, যে আল্লাহর দিকে আহ্বান করে, সৎকর্ম করে এবং বলে, ‘নিশ্চয়ই আমি মুসলমানদের অন্তর্ভুক্ত।’”
—সূরা ফুসসিলাত: ৩৩
অতএব, রাসুলুল্লাহ ﷺ-এর দাওয়াতি জীবন শুধু ইতিহাসের একটি অধ্যায় নয়; বরং কিয়ামত পর্যন্ত দাঈদের জন্য একটি বাস্তব আদর্শ। সত্যের পথে চলতে হলে তাঁর মতো ধৈর্য, ত্যাগ, সাহস, প্রজ্ঞা ও আল্লাহর ওপর পূর্ণ ভরসা গড়ে তুলতে হবে।
লেখক : মুফতী মুক্তাদির হোসাইন মারুফ (মুফাচ্ছিরে কুরআন, খতীব ও সম্পাদক)


