Google search engine
Homeঅপরাধআইফোন ছিনতাই থেকে নির্মম হত্যা, যেভাবে উদঘাটিত হলো অপ্রতীম হত্যার রহস্য

আইফোন ছিনতাই থেকে নির্মম হত্যা, যেভাবে উদঘাটিত হলো অপ্রতীম হত্যার রহস্য

কুমিল্লা প্রতিনিধি: কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. নাহিদা বেগমের একমাত্র সন্তান ইশায়াত শাহরিয়ার অপ্রতীম (১৩) হত্যাকাণ্ডের রহস্য অনেকটাই উন্মোচিত হয়েছে। পুলিশের তদন্তে উঠে এসেছে, মায়ের ব্যবহৃত আইফোনটি ছিনিয়ে নেওয়ার উদ্দেশ্যেই অপ্রতীমকে পরিকল্পিতভাবে নির্জন এলাকায় নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। সেখানে মোবাইল ফোন নিতে বাধা দেওয়ায় তাকে বাঁশের লাঠি দিয়ে মাথায় আঘাত করা হয়। পরে তার মরদেহ ফেলে রেখে আইফোন নিয়ে পালিয়ে যায় অভিযুক্তরা।

নিখোঁজ হওয়ার পর শুরু হয় অনুসন্ধান

গত ১৮ সেপ্টেম্বর বিকেল সাড়ে ৩টার দিকে কুমিল্লার কোটবাড়ি-গন্ধমতী এলাকার বাসা থেকে মায়ের আইফোন নিয়ে বন্ধুদের সঙ্গে ছবি তুলতে বের হয় সপ্তম শ্রেণির শিক্ষার্থী অপ্রতীম। এরপর সে আর বাড়ি ফেরেনি। পরিবারের সদস্যরা বিভিন্ন স্থানে খোঁজাখুঁজি করেও সন্ধান না পেয়ে থানায় সাধারণ ডায়েরি করেন।

নিখোঁজের পর পুলিশ আশপাশের বিভিন্ন এলাকার সিসিটিভি ফুটেজ পর্যালোচনা শুরু করে। তদন্তে একটি গুরুত্বপূর্ণ ফুটেজ পাওয়া যায়, যেখানে অপ্রতীমকে সাইফুল ইসলাম ওরফে তুহিনের সঙ্গে যেতে দেখা যায়। পুলিশের দাবি, ১৮ সেপ্টেম্বর বিকেল সোয়া ৩টার দিকে তুহিন অপ্রতীমকে লালমাই পাহাড়ের সানন্দা এলাকার নির্জন জঙ্গলের দিকে নিয়ে যায়।

২১ ঘণ্টা পর মিলল মরদেহ

নিখোঁজের প্রায় ২১ ঘণ্টা পর ১৯ সেপ্টেম্বর দুপুরে কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের কাছাকাছি লালমাই পাহাড়ঘেঁষা সানন্দা এলাকার একটি জঙ্গল থেকে অপ্রতীমের মরদেহ উদ্ধার করা হয়। স্থানীয় একজন ব্যক্তি বাঁশ কাটতে গিয়ে মরদেহ দেখতে পেয়ে বিষয়টি জানানোর পর পুলিশ ঘটনাস্থলে যায়।

মরদেহ উদ্ধারের পর সিসিটিভি ফুটেজে অপ্রতীমের সঙ্গে থাকা তুহিনকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য হেফাজতে নেওয়া হয়। এরপর তদন্তে আরও দুজনের নাম আসে।

আইফোন উদ্ধারে তদন্তে বড় অগ্রগতি

তদন্তের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ আলামত হয়ে ওঠে অপ্রতীমের মায়ের আইফোন। পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, তুহিনের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে তার বাসায় অভিযান চালিয়ে আইফোনটি উদ্ধার করা হয়। ফোনটি তার বাসার খাটের তোশকের নিচে পাওয়া যায়।

পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, সিসিটিভি ফুটেজ, জিজ্ঞাসাবাদ এবং উদ্ধার হওয়া মোবাইল ফোনের তথ্য একত্র করে হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িতদের শনাক্ত করা সম্ভব হয়।

পুলিশের দাবি—মোবাইল ছিনিয়ে নেওয়ার সময় বাধা দিয়েছিল অপ্রতীম

২০ সেপ্টেম্বর কুমিল্লা জেলা পুলিশ সুপারের কার্যালয়ে সংবাদ সম্মেলনে পুলিশ জানায়, অপ্রতীমের কাছে থাকা আইফোন ছিনিয়ে নেওয়ার উদ্দেশ্যে তাকে নির্জন স্থানে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। সেখানে ফোন কেড়ে নেওয়ার সময় অপ্রতীম বাধা দিলে ধস্তাধস্তি হয়। একপর্যায়ে তুহিনসহ অন্যরা বাঁশের লাঠি দিয়ে তার মাথায় আঘাত করে। এতে তার মৃত্যু হয় বলে পুলিশের তদন্তে উঠে এসেছে।

পুলিশের দাবি, অপ্রতীমের মৃত্যু নিশ্চিত হওয়ার পর অভিযুক্তরা আইফোন নিয়ে ঘটনাস্থল থেকে চলে যায়।

তিন আসামির আদালতে স্বীকারোক্তি

এই মামলায় গ্রেপ্তার তিন আসামির মধ্যে সাইফুল ইসলাম ওরফে তুহিনের বয়স ১৯ বছর। অপর দুজন অপ্রাপ্তবয়স্ক হওয়ায় তাদের পরিচয় প্রকাশ করা হয়নি।

২০ সেপ্টেম্বর রাতে কুমিল্লার সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে তিনজনের ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি নেওয়া হয়। পুলিশ জানিয়েছে, তিনজনই হত্যার দায় স্বীকার করেছে। তবে আদালতে দেওয়া জবানবন্দির বক্তব্যসহ অন্যান্য আলামত এখন তদন্তের অংশ হিসেবে যাচাই করা হচ্ছে।

আরও কেউ জড়িত কি না, তদন্ত চলছে

পুলিশ বলছে, হত্যাকাণ্ডে আরও কেউ জড়িত ছিল কি না, সেটিও তদন্ত করে দেখা হচ্ছে। একই সঙ্গে আটক আরেক ব্যক্তির সম্পৃক্ততার বিষয়ে তদন্ত করা হয়েছে। সর্বশেষ পাওয়া তথ্যে, শাহরিয়ার আনাস নামে আটক একজনের বিরুদ্ধে সম্পৃক্ততার প্রমাণ না পাওয়ায় তাকে জিজ্ঞাসাবাদের পর ছেড়ে দেওয়া হয়েছে।

অর্থাৎ, এখন পর্যন্ত পুলিশের তদন্তে যে চিত্র সবচেয়ে স্পষ্ট হয়েছে তা হলো—অপ্রতীমকে নির্জন স্থানে নিয়ে যাওয়া, আইফোন ছিনিয়ে নেওয়ার চেষ্টা, বাধা দেওয়ার পর মাথায় আঘাত এবং পরে মরদেহ ফেলে পালিয়ে যাওয়া। তবে মামলার বিচারিক প্রক্রিয়ায় আদালতে উপস্থাপিত প্রমাণের ভিত্তিতেই শেষ পর্যন্ত অপরাধের দায় নির্ধারিত হবে।

পরিবার ও শিক্ষার্থীদের মধ্যে শোক ও ক্ষোভ

অপ্রতীম ছিল পরিবারের একমাত্র সন্তান। তার মায়ের কর্মস্থল কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের মধ্যেও হত্যাকাণ্ডটি ব্যাপক প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করেছে। বিচারের দাবিতে শিক্ষার্থীরা বিক্ষোভ ও মহাসড়কে অবস্থান কর্মসূচি পালন করেন।

অপ্রতীমের হত্যাকাণ্ড শুধু একটি পরিবারের একমাত্র সন্তান হারানোর ঘটনা নয়; তদন্তে উঠে আসা তথ্য শিশু-কিশোরদের বন্ধুত্ব, চলাফেরা এবং দামি মোবাইল ফোনের নিরাপত্তা নিয়েও নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছে।

আরো সংবাদ

কমেন্ট করুন

Please enter your comment!
Please enter your name here

- Advertisment -
Google search engine

সর্বশেষ